Monday, November-30, 2020, 10:31 PM
Breaking News
Home / গল্প ও প্রবন্ধ / অসম্পূর্ন

অসম্পূর্ন

আস্তে আস্তে হাঁ হয়ে যাচ্ছে মুখটা। কালো কুচকুচে ঠোঁটগুলোর ভেতর থেকে বের হয়ে আসছে বিভৎস কালো জিভ। জিভের মাথাটা সাপের মতো চেরা লকলকে। গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ্রের খরতাপে চিরে যাওয়া মাঠের মত দৃশ্যমান গাল গুলো ফেটে ফোটায় ফোটায় রক্ত ঝড়ছে যেন ।কালো কুচকুচে চোখদুটোতে আজন্মের হাহাকার আর জিঘাংসা। পুরো মুখ যেন অতিমানবীয় দুঃখ,যন্ত্রনা আর আর্তনাদের এক অবিমিশ্র প্রতিকৃতি। জীবনের সকল ক্লেশ,যন্ত্রনা নিয়ে সে হা হয়ে যাচ্ছে। সেই জিভের পেছনের অতল গহবর থেকে যে ঘূর্ণায়মান অন্ধকার ঘূর্ণি চলছে তাতে একেবারে ঝাঁকুনি খেয়ে চোখ মেললো ফারহানা। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে নীল থ্রি-পিসটা। চোখ মেলে বাইরে তাকিয়ে নিম গাছের ডালে বসা কালো কাকটার ওপর নজর পড়ল। কুচকুচে কালো ঠোঁটটা দেখে গতরাতের ভয়ার্ত স্বপ্নটার কথা মনে পড়ল আবার । কিছুক্ষণ সে তাকিয়ে রইল কালো আর ছাই রং এর মিশেল এর কাকটার দিকে। কি অদ্ভূত জীবন এই পাখিটার! শুধুমাত্র উদরপূর্তির চিন্তা ছাড়া আর কোন চিন্তা নেই এই পরভৃৎর। আচ্ছা ও ও কি স্বপ্ন দেখে?  বা কোন দুঃস্বপ্ন ?  সেই দুঃস্বপ্ন কী ওকে তাড়িয়ে বেড়ায়? ও ও কি ডানা ঝাপটে উঠে যায় ঘুম থেকে ?   …….. ভাবতে ভাবতে ফারহানা উঠে দাড়ালো । খাটের পাশের মোড়ার ওপর রাখা বোতল থেকে কয়েক ঢোক পানি খেল। মশারির কোনাটা খুলতে খুলতে জানালার পাশে যেয়ে দাড়ালো। ছোট ভাইটা গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে বিছানায়। ময়লা স্যান্ডো গেঞ্জিটার কয়েক জায়গায় ছিদ্র হয়ে আছে। বারো বছর বয়সী ভাইটাকে বয়স অনুপাতে ছোটই দেখায় । ভাইটার দিকে তাকিয়ে এসব ভাবতে ভাবতে মরচে ধরা জানালার শিকে হাত রেখে ফারহানা বাইরে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন। মাথাটা হালকা ধরে আছে। ভালো ঘুম হয়নি রাতে। রাশেদের কন্ঠস্বরে ভাবনার জগতে ছেদ পড়ল। কিরে আপু , দিবিতো আমাকে নতুন ড্রেস বানিয়ে ? তাকিয়ে দেখল , রাশেদ ঘুম থেকে জেগে উৎসুক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।একটা শীতল দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ফারহানার বুক থেকে। স্বামীটা হঠাৎ ই রোড অ্যাক্সিডেন্ট মারা যাবার পর জীবনটা কিছুটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলো ফারহানার। স্বল্পশিক্ষিত শ্বশুরবাড়ি লোকজন এক প্রকার অপবাদ দিয়েই তাকে বাপের বাড়ী পাঠায়। সদ্যমৃত মায়ের সংসারে এসে স্বল্প বেতনের চাকুরী করা বাবার ছত্রছায়ায় আবার তার নতুন জীবনের পথচলা। সমস্ত মায়া যেয়ে পড়ল এই সদ্য মা হারা ভাইটার ওপর। অতটা আহমরি সুন্দরিও না সে যে, সহসাই অন্যকারো জীবনের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে পারে। এই সমস্ত ভাবতে ভাবতে ফারহানা উঠে রান্নাঘরে যায়।অন্ধকারাচ্ছন্ন স্যাতস্যাতে শাওলা মলিন এক রান্নাঘর । রাশেদ ও চা খাওয়াটা রপ্ত করেছে। আদা কুচি আর লেবু মিশানো চায়ের সাথে মুড়ি তার এক পছন্দের খাবার । বাবাকে এক কাপ চা আর ন্যাতানো দুটো টোস্ট দিয়ে এল ফারহানা। সদ্য বিধবা মেয়ে আর মাঝ বয়সে এসে নিজেও বিপত্নীক হওয়ার দোড়গোড়ায় দাড়ানো জীবনযুদ্ধে পরাজিত এক সৈনিক যেন।

নাস্তা বানিয়ে বাবাকে খাইয়ে কাজে পাঠানোর পরে ভাইটাকে রেডি করিয়ে স্কুলে পাঠানোর পালা ।শেষে আলমারি থেকে ছোট একটা প্যাকেট বের করে নিয়ে বিছানায় রাখালো ফারহানা।প্যাকেটে আছে ১৫০০০ টাকা দামের একটি ঘড়ি ।স্বামীর মৃত্যুর পর হাতের অল্প কিছু সম্বল নিয়ে এক দুঃসম্পর্কের ভাইয়ের সহযোগিতায় এই অনলাইন ব্যবসার শুরু। চোরাই পথে কসমেটিক্স,ঘড়ি ইত্যাদি এনে সে বিক্রি করে। বিনিময়ে লাভের ৫০% ভাইটাকে দিতে হয়। আজ ঘড়িটা যাবে আজিমপুরে এক মাঝবয়সি মহিলার কাছে।কাপড়চোপড় চেঞ্জ করে কাধের ব্যাগে ঘড়ির বক্সটা নিয়ে ফারহানা বের হয়ে পড়ল। আজিমপুরে যেয়ে লোকজনকে জিজ্ঞেসা করে কাগজে লেখা ঠিকানাটায় পৌছাল। পড়ন্ত দুপুর , এলাকাটা অনেকটা নির্জন। সদর দরজাটা খোলাই ছিল। আস্তে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। মেইন গেট পার হয়ে ছোট্ট একটা বারান্দা পেড়িয়ে আরেকটা দরজা পড়ল সামনে। দরজার সামনে দাঁড়িয়েফারহানা ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মুছল। কলিংবেল দেবার পরও মিনিট পাঁচেক চলে যাবার পরও কেউ যখন দরজা খুলল না ফারহানা , কিছুটা ইতস্তত করে আস্তে করে দরজায় ধাক্কাদিল।আশ্চর্যজনকভাকে দরজাটা খোলা। একটু অপেক্ষা করে সে ভেতরে ঢুকে গেল বাড়িটা ডুপ্লেক্স।মাঝখানের হলরুম থেকে ঘোরানো একটা সিড়ি উঠে গেছে ওপরে। ফারহানা কয়েকবার ডাকল।মিসেস করিম? মিসেস করিম? বাড়িতে আছেন? কোন সাড়া পাওয়া গেলনা। বাড়ির আসবাবপত্রে আভিজাত্যের ছোঁয়া। সিড়ির গোড়ায় দুটো লাগেজ রাখা। ফারহানা যেইনা আরেকবার ডাকতে যাবে, সিড়ির মাথায় এক ভদ্রলোককে দেখা গেল। চাপ দাড়ি আর কালো স্যুটে মোড়ানো ভদ্রলোক প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে সিড়ি দিয়ে নেমে এলেন। কি চাই? ভিতরে কিভাবে ঢুকলেন? উৎসুকভাবে তিনি প্রশ্ন করলেন। ওড়নাটা ঠিক করতে করতে ফারহানা জবাব দিল……. আসলে অর্ডার ছিল একটা, মিসেস করিম এর। মিসেস করিম? ও আচ্ছা, বুঝেছি। ওর তো আবার প্রতিদিনই নতুন নতুন কিছু কেনাকাটা না করলেই নয়। কিন্তু সে তো দেশের বাইরে গেছে। দুই মাস আগে ফিরবে না। আমিও যাচ্ছি। ওই যে, ব্যাগ গোছানো আছে। ভদ্রলোকের কথার জবাবে মুখ কালো করে ফারহাননা বলল ওহ, আচ্ছা কিন্তু ……… না মানে, সামনের মাসে আমার ভাই এর জন্মদিন। টাকাটা পেলে না হয়……। আচ্ছা যাই হোক কি আর করা……চোখে মুখে চরম অসহায়ত্বের ছাপ নিয়ে ফারহানা যখনি বের হয়ে আসতে নিচ্ছিলো তখনি ভদ্রলোকের কন্ঠস্বর… আচ্ছা শুনুন…..বসুন। ফারহানা বসতে বসতে বলল। একটু পানি পাওয়া যাবে? যা গরম! ভদ্রলোক ভেতরে যেয়ে বেশ কারুকার্যময় একটা পানির বোতল এনে টেবিলে রেখে মেইন দরজাটা বন্ধ করে  দিয়ে এসে ফারহানার মুখোমুখি সোফায় বসলেন। ভদ্রলোকের চোখেমুখের দৃষ্টি অন্যরকম দেখালেও নির্জন একটা বাসায় এরকম ভরদুপুরে একাকী এক মেয়েকে পেলে সেই মেয়ের যেইরমক ভয় পাওয়া উচিৎ সেরকম কোন অনুভূতি ফারহানার চেহারায় দেখা যাচ্ছেনা। ভদ্রলোক চেক বের করে লিখতে লিখতে জানতে চাইলেন যে, অন বিহাফ অফ কার নামে লিখব? ফারহার বলল… ফারহানা আফরোজা। বলতে বলতে তার চোখে মুখে ক্রর এক হাসি ফুটে উঠল। আস্তে করে বলল সে, সরি‌ স্যার, আসলে আমার করার কিছু ছিলনা। ভদ্রলোক চোখে তুলে চাইত না চাইতেই ফারহানার হাতে শোভা পেল নাইন এম এম এর ব্ল্যাক কালারের এক রিভলবার। ফারহানার রহস্যজনক দৃষ্টি আর মি. করিমের হতবিহবল চেহারার মধ্যদিয়ে সাইলেন্সর লাগানো পিস্তলের নল থেকে ধোয়া ওঠা বুলেটের আঘাত কৃষ্ণচুড়ার মত লাল রক্তে রাঙানো বুকের ওখানে এক ক্ষতস্থান তৈরি হল।হতচকিত মি. করিমের একটা ছবি তুলে whatsapp এ পাঠালো ফারহানা। ফারহানা ওড়নাটা দিয়ে পানির বোতলটা মুছে নিয়ে whatsapp এ ফিরতি মেসেজ এর অপেক্ষায় রইলো। ১-২ মিনিট পরে মোবাইলে মেসেজ আসলো যে, অ্যাকাউন্টে টাকা ডুকেছে ১ লাখ। ফারহানার স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে ওড়নাটা ভালো করে পেঁচিয়ে পেছনের দরজাটা দিয়ে বের হতে যেয়ে দেখলো বাগানে মালি অলস হাতে কাস্তে ধরে নিয়ে ঝিমাচ্ছে। পায়ের শব্দে ফারহানার দিকে চোখ মেলে তাকালেই ফারহানার দ্বিতীয় গুলিটি তার কপাল বরাবর ঢুকে গেলো। “চাচা , এই পৃথিবীতে কারণ ছাড়াও কিছু ঘটে। ভুল জায়গায় ভুল সময়ে থাকলে যে তার কিছু চুকাতে হয় আরকি……” বলতে বলতে ফারহানা বের হয়ে এসে ফাঁকা একটা রিকশায় উঠে চলতে শুরু করল। সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাসে বেশ ফুরফুরে লাগছিলো তার । বাবার নাম্বারটায় ডায়াল করে বলল- বাবা তোমার হার্টের অপারেশনটার জন্য হ্যাঁ বলেই-দিচ্ছি কিন্তু। বাবাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রিকশাওয়ালাকে বলল ইস্টার্ন মল্লিকার দিকে যানতো চাচা। রাশেদের স্কুলের ইউনিফর্ম ছাড়াও আরো কয়েক সেট ড্রেস নিতে হবে।

      রিকশা ছুটছে। সন্ধ্যার বাতাসে ফারহানা পেছনে ফেলে আসছে নিজের জীবনের এক গোপন জটিল অধ্যায়। অতি সাধারণ এক রমনীর ধারন করা এক অসাধারণ গল্পের অবতারক হয়ে ছুটে চলছে সে।

লেখিকা

  শারমিন সালেহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *